সম্প্রতি সামাজিকমাধ্যমে দুটি পোস্ট ভাইরাল হয়েছে। একটি বলিউডের তনুশ্রী দত্তের, অন্যটি বাংলাদেশি অভিনেত্রী মৌ শিখার। দুজনই জানান যে, এই মুহূর্তে তাঁদের হাতে কোনো কাজ নেই। বলিউডে এই সংকট যদিও ভিন্ন কারণে, তবে বাংলাদেশে করোনা মহামারির সময় থেকেই ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ কমতে থাকে। তারপর সেই সংকটাবস্থা কাটিয়ে যখন শিল্পীরা একটু একটু করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলেন, তখনই দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে থাকে। অবশেষে গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়।
মূলত তখন থেকেই দেশের পরিস্থিতি বিশৃঙ্খল। বিনোদন অঙ্গনে নেমে আসে স্থবিরতা, যা এখনও কাটেনি বলেই জানাচ্ছেন শিল্পীরা। ফলে এখন অনেকে কর্মহীন কিংবা কাজ কমে গেছে। বিশেষ করে যাঁরা ছোটোখাটো চরিত্রে কিংবা এক্সট্রা হিসেবে কাজ করেন, তাঁরা সংসার চালাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন।
সম্প্রতি অভিনেত্রী মৌ শিখা তাঁর দুরাবস্থার কথা তুলে ধরেন, যা হইচই ফেলে দেয় নাটক ও চলচ্চিত্র জগতে। শুক্রবার (২৫ জুলাই) ফেসবুকের এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আমি মৌ শিখা। অনেক বছর থেকে অভিনয় করে আসছি। এতদিন নিজেকে অভিনেত্রী হিসেবেই জানতাম, কিন্তু গত আড়াই মাস ধরে নিজেকে অভিনেত্রী ভাবতে লজ্জা হচ্ছে। আগে যেখানে মাসে ১৫ থেকে ২০ দিন কাজ করতাম, সেখানে আড়াই মাস যাবৎ মাসে চার থেকে পাঁচ দিন কাজ করছি। তাহলে কীভাবে মনে হবে আমি অভিনয়শিল্পী?’

আগের তুলনায় কাজ কমে গেছে—এমনটা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অভিনয় করেই আমার সংসার চলে। তবে আমি জানি বেঁচে থাকতে আমার মূল্যায়ন করা না হলেও আমার মৃত্যুর পর কিছু মানুষ হলেও আমাকে মনে রাখবে, হয়তো বলবে—আহা রে, মহিলা তো কত ভালো ছিল! কত সহজ-সরল ছিল। কারও সাত-পাঁচে ছিল না, কারও সামনে-পিছনে ছিল না। আহা রে, মহিলাটার আত্মা শান্তি পাক। কিন্তু তাতে কী লাভ হবে? আমার বেঁচে থাকতে তো দরকার আমার কাজের।’
মৌ শিখা আরও বলেন, ‘বেঁচে থাকতেই দেখে যেতে চাই আমার মূল্যায়ন হচ্ছে, কিন্তু সেটা কি আদৌ দেখে যেতে পারব—আমি জানি না। তবে আমার অনুরোধ, আমি মরে গেলে দয়া করে কেউ আফসোস করবেন না। আমাকে মনে করারও কোনো দরকার নেই। হঠাৎ করে কেন কাজ কমে গেল, আমাকে ডিরেক্টররা ডাকছেন না কেন, মনে করছেন না কেন তাদের গল্পের চরিত্রের সঙ্গে আমি নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারব, আমি তো আমার রেমুনারেশন বাড়াইনি, ২৫ বছর যাবৎ মিডিয়ায় আছি, এখনও আমার রেমুনারেশন খুব একটা বেশি না, তাহলে?’
সবশেষে তিনি বলেন, ‘যে কয়দিন বাঁচি, কাজ করে যেতে চাই। আপনারা ব্যাপারটা দেখবেন, আমার সহকর্মী যারা আছেন, তারা আমার ব্যাপারটা দেখে একটু সাহায্য করবেন। একজন শিল্পীর জন্য হঠাৎ করে কাজ কমে যাওয়া কম কিছু না। আপনারা পাশে থেকে আমাকে সাহায্য করবেন। আল্লাহ সহায় আছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুধু মৌ শিখাই নন, এমন আরও অনেকে রয়েছেন, যাঁরা বর্তমান পরিস্থিতিতে টানাপোড়েনের মধ্যদিয়ে দিন পার করছেন। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে প্রযোজক ও স্পন্সর সংকট এবং নাটক-চলচ্চিত্রের নির্মাণ কমে যাওয়া।

তবে শীর্ষ সারির অভিনয়শিল্পীরা এই ক্ষেত্রে কিছুটা ব্যতিক্রম। তাঁদের কাজ কমে গেলেও, জীবনযাপনে সেই প্রভাব প্রকট হয়ে উঠেনি। বলা যায়, কোনোভাবে মানিয়ে নিয়েছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে অভিনেত্রী মৌসুমী হামিদ বলেন, ‘দেশের পরিস্থিতি যেহেতু এখনও খারাপ, তাই কাজ থাকবে না, কাজ কম থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। এমন নয় যে কেবল কয়েকজনের হাতে কাজ কম বা ছোটখাটো চরিত্রে যাঁরা অভিনয় করেন, তাদেরই একমাত্র কাজ নেই। সবারই একই অবস্থা। সব সেক্টরেই কাজ কম।’
নেপথ্যের কারণ হিসেবে তিনি জানান, দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রযোজক বা ইনভেস্টর কমে গেছে। যাঁরা নিয়মিত প্রযোজনা করতেন, তাঁরাও কাজ করছেন হিসাব কষে।
মৌসুমী হামিদ বলেন, ‘নাটক-সিনেমার বাজেট কমে গেছে, কেউই ইনভেস্ট করছেন না; যে কারণে কাজ কমে গেছে।’
এমন পরিস্থিতির কথা জানালেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী মনিরা মিঠুও। তিনি বলেন, ‘আমার হাতে কাজ আছে। আগে যেমন ছিল, এখনও তেমনই কাজ আছে। আমি এত বেশি কাজ করিও না, মাঝেমধ্যে বিরতি দিয়ে দিয়ে কাজ করি। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে পেমেন্ট সংক্রান্ত ইস্যু আছে। এ ছাড়া আকস্মিক বাজেট হ্রাস পেয়েছে। যেমন, কেউ রয়েছেন পাঁচ-ছয় হাজার টাকায় মা চরিত্রে কাজ করেন, আবার অনেকে তিন হাজার টাকায় মা চরিত্র করেন। এখন যাঁদের বাজেট কম, তাঁরা পাঁচ হাজার টাকার মায়ের বদলে তিন হাজার টাকার মাকেই নিচ্ছেন। যদি গল্পে এমন একটা চরিত্রের চাহিদা থাকে, যেটা মনিরা মিঠু, সাবেরী আলম বা চিত্রলেখা গুহ ছাড়া পারবে না; তখন তারা আমাদেরকে নেন, নয়তো চলে যান তিন হাজার টাকার মধ্যে। অর্থাৎ যাঁরা পাঁচ-ছয় হাজার টাকায় কাজ করতেন, তাদের চাহিদাটা কমে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত জুলাইয়ে এত বড় একটা আন্দোলন হলো, এত বড় আন্দোলনের পরে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়েছে, যে কারণে এই সময়ে একটা আর্থিক সমস্যা দাঁড়িয়েছে—এটা অস্বীকারের উপায় নেই। সেই বিষয়টির প্রভাব পড়েছে মিডিয়ার ওপর। আমি মনে করি, এই পরিস্থিতি ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে।’
তবে এই সংকট কাটিয়ে উঠার উপায় হিসেবে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থায় স্থিতিশীলতা এলে বিনোদন অঙ্গনের বর্তমান সংকটের উত্তরণ ঘটতে পারে।
অভিনয় শিল্পী সংঘের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ মামুন অপু বলেন, ‘গত কয়েক মাস ধরেই এই পরিস্থিতি সম্পর্কে আমরা অবগত। কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক বা আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি সার্বিকভাবে স্থিতিশীল না হলে, আমদের একটা সংগঠনের পক্ষ থেকে কী-বা করা সম্ভব? আগে দেশের অর্থনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে পরেই না শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশের একটা সুযোগ থাকে।’
শিল্পীদের কাজ কমে যাওয়ায়, অনেকে ভয়াবহ পরিস্থিতি পার করছেন—এমনটা জানিয়ে অপু বললেন, ‘নির্মম হলেও সত্য যে, দিনদিন পরিস্থিতি স্থবির থেকে স্থবির হচ্ছে। স্পন্সর সংকট রয়েছে। তারপর আমি শুনেছি, মনিটাইজেশন ইস্যুতে ফেসবুক বা ইউটিউব থেকে যে আয় আসত, সেটাও কমে যাচ্ছে। এ ছাড়া চ্যানেলগুলোয় নতুন নতুন ধারাবাহিক বা সিরিজ নির্মাণ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, পুরনো কনটেন্ট দিয়েই চলছেন তারা। সব মিলিয়ে, শিল্পীরা খুবই শোচনীয় এক পরিস্থিতির মধ্যে আছে। শিখা বলতে পেরেছে, অনেকে বলতেও পারছেন না। কোভিডের সময় বলা যেত যে, আমরা (চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি বা অভিনয় শিল্পী সংঘ) যেখান থেকে পেরেছি সাহায্য এনে সাহায্য দিতে পেরেছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে কেউ বলতেও পারছে না যে, আমার সাহায্য লাগবে বা চলতে পারছি না।’
প্রযোজক সংকট ও স্পন্সর না-পাওয়ার বিষয়ে এই অভিনেতা বলেন, ‘প্রযোজক কমেছে, স্পন্সরও কমেছে। কারণ স্পন্সর না থাকলে কাজটা অন-এয়ার হবে কীভাবে? সেই জায়গাতে যদি সংকট থাকে, তাহলে প্রযোজক ঝুঁকি নেবে কেন? প্রযোজক তো এই ঝুঁকি নেবে না।’









